Parhelion বা একত্রে তিনটি সূর্য
ছবিতে একধরনের হ্যালো (Halo) ঘটনা দেখা যাচ্ছে, যাকে Sun Dog বা পারহেলিয়ন (Parhelion), বহুবচনে পারহেলিয়া (Parhelia) বলা হয়। বাংলায় একে কিরীট বা জ্যোতির্বলয় বলে। এ ঘটনা ঘটলে মনে হয় যে প্রকৃত সূর্যের পাশে আরও ২টি সূর্য রয়েছে যেগুলো মূল সূর্য থেকে কিছুটা অনুজ্জ্বল। পারহেলিয়ন শব্দটি গ্রিক শব্দ "para-Helios" থেকে উদ্ভূত যার অর্থ "সূর্যের পাশে"।
আবহাওয়াবিদ্যার (Meteorology) ভাষায়, এটি একটি বায়ুমণ্ডলীয় আলোকীয় ঘটনা (atmospheric optical phenomenon), যার জন্য মূল সূর্যের এক বা উভয় দিকে সূর্যের অনুরূপ প্রতিবিম্ব বা উজ্জ্বল বিন্দুসদৃশ একটি বিম্ব দেখা দেখা যায়।
সূর্য যখন দিগন্তের (Horizon) কাছাকাছি থাকে, তখন পারহেলিয়া সবচেয়ে স্পষ্ট দেখা যায়। সাধারণত জানুয়ারী, এপ্রিল, আগস্ট এবং অক্টোবরে সূর্য দিগন্তের কাছাকাছি থাকে এবং পারহেলিয়া সবচেয়ে বেশি ও স্পষ্ট দেখা যায়। শীতকালে উচ্চ ও মধ্য অক্ষাংশে অবস্থিত দেশগুলোতে পারহেলিয়ন মাঝে মধ্যেই দেখা যায়। কেননা, তখন সূর্য দিগন্তের কাছাকাছি অবস্থানে থাকে। শীত প্রধান দেশে পারহেলিয়া বেশি দেখা গেলেও, গ্রীষ্মপ্রধান দেশে এবং যেকোনো ঋতুতে বিশ্বের যেকোনো জায়গা থেকে এটি দেখা যায়। তবে সবসময় একইরকম স্পষ্ট বা উজ্জ্বল হয় না। কখনো কখনো পারহেলিয়াতে লাল এবং নীল রঙের উপস্থিতি পরিলক্ষিত হয়। পারহেলিয়নের সীমানা ঘেষে ঠিক ভেতরের দিকের প্রান্তের রঙ কখনো কখনো লাল হয়। আবার ঠিক কিনারা ঘেষে বাইরের দিকের রঙ নীল হতে দেখা যায়।
পারহেলিয়া সাধারণত সূর্যের উভয়দিকে ২২ ডিগ্রি কোণ করে থাকে। এই হ্যালো ঘটনাটি বরফের ষড়ভুজাকৃতির ক্রিস্টালের জন্য সৃষ্ট হয়, যার উপর আলোকরশ্মি পড়লে, আলো নানা কোণে প্রতিসরিত হয়। পারহেলিয়া সৃষ্টি হয় সেসব বরফ স্ফটিকের প্রতিসরণ, ও প্রতিফলন উভয়ের মাধ্যমে।
পারহেলিয়ন ঘটতে যে ধরনের মেঘের উপস্থিতি প্রয়োজন হয়, সেগুলো হল সাইরাস (Cirrus) মেঘ বা অলক মেঘ। এই মেঘগুলি দেখতে অনেকটা ছড়ানো পালকের মতো এবং তাতে বরফের ছোট ছোট অসংখ্য স্ফটিক উপস্থিত থাকে।
পারহেলিয়ন ঘটার জন্য এই সাইরাস মেঘের অস্তিত্ব অবশ্যই থাকতে হবে। কেননা, পারহেলিয়া সাধারণত প্লেট বা থালা আকৃতির ষড়ভুজাকৃতির বরফ স্ফটিক থেকে আলোর প্রতিসরণ এবং ছড়িয়ে পড়ার কারণে তৈরী হয়। বায়ুমণ্ডলে পানিকণা জমে ছোট, সমতল, ষড়ভুজাকৃতির বরফের স্ফটিকে পরিণত হয়। ভূপৃষ্ঠ থেকে উচ্চ অবস্থানে থাকা এবং নিম্ন তাপমাত্রার সাইরাস (Cirrus) বা সিরোস্ট্রেটাস (Cirrostratus) মেঘের মধ্যে, অথবা ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি বায়ুর স্তরে হিমায়িত আর্দ্র বাতাসে এই ষড়ভুজাকৃতির বরফের স্ফটিক থাকে, যা ডায়মন্ড ডাস্ট (Diamond Dust) নামে পরিচিত। এই বরফের স্ফটিকগুলো ছোট ছোট প্রিজম হিসাবে কাজ করে এবং সূর্যরশ্মিকে ২২ ডিগ্রি কোণে প্রতিসরিত করে। যেহেতু ষড়ভুজাকৃতির বরফের স্ফটিকগুলি অনুভূমিকভাবে বায়ুমন্ডলে ভাসতে থাকে, সেহেতু সূর্যালোক অনুভূমিকভাবে এগুলোর মধ্য দিয়ে প্রতিসরিত হয় এবং পারহেলিয়া সূর্যের উভয়দিকে দেখা যায়। তবে যদি সূর্যের শুধুমাত্র একপাশে সাইরাস মেঘ থাকে, তখন কেবল একটি পারহেলিয়ন গঠিত হবে।
পারিপার্শ্বিক অবস্থার উপর নির্ভর করে পারহেলিয়া ১৫ থেকে ৩০ মিনিট স্থায়ী হতে পারে। কখনও বা আরও কিছুক্ষণ দেখা যেতে পারে। বরফের স্ফটিকগুলির আকৃতি পারহেলিয়ার আকার নির্ধারণ করে, যা সূর্যের চারপাশে একটি সম্পূর্ণ বৃত্ত হতে পারে, যাকে হ্যালো (Halo) বলা হয়, আবার সূর্যের উভয় পাশে দুটি উজ্জ্বল বিম্ব হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
কিছু কিছু ক্ষেত্রে চাঁদের পারহেলিয়নও দেখা যায়। তবে তা খুব বিরল ঘটনা। এটি শুধুমাত্র তখনই দেখা যায় যখন পূর্ণিমার সময় চাঁদ উজ্জ্বল থাকে। সেই সাথে সাইরাস মেঘগুলিকে অবশ্যই চাঁদের আলোকে প্রতিসরণ করতে সক্ষম হওয়ার অবস্থানে থাকতে হবে।
বিশ্বের যেসব অঞ্চলে এই ঘটনা বেশি দেখা যায়, সেখানকার অনেক কৃষকই পারহেলিয়নকে প্রতিকূল আবহাওয়ার আগমনের চিহ্ন বলে মনে করেন। অনেক জায়গায় সাইরাস মেঘ শুধুমাত্র ঝড় আবির্ভাবের আগের দিনগুলিতে দেখা যায়। যখন হ্যালোটি আরও ডিম্বাকৃতি আকার ধারণ করে, তখন ধারণা করা হয় যে, ১২-২৪ ঘন্টার মধ্যে আবহাওয়া আরও খারাপ হবে।
তথ্যসূত্র:
▪︎ https://www.britannica.com/science/sun-dog
▪︎ https://skybrary.aero/articles/parhelion
ছবি: ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত
▪︎ https://www.metoffice.gov.uk/weather/learn-about/weather/optical-effects/parhelion





Comments
Post a Comment